
Post Updated at 16 Mar, 2026 – 12:04 PM
যাকাত আদায়ের সময়
নেসাবের বছর পূর্ণ হওয়ার পর যাকাত আদায় করা ফরয হয়। এরপর আর যাকাত আদায় করতে দেরি করা উচিত নয়। এ জন্যে নিসাবের মালিক হওয়ার তারিখ মনে রাখা এবং প্রতি বছর ঠিক সেই সময়েই যাকাত দেওয়া কর্তব্য। অন্য কোনো মাসের অপেক্ষায় দেরি করা ঠিক নয়। অনেকেই রমযান মাসে যাকাত আদায় করলে অধিক সওয়াব পাওয়া যাবে- এ ধারণা থেকে বছর পূর্ণ হয়ে যাওয়ার পরও যাকাত আদায়ে বিলম্ব করেন এবং রমযানে আদায় করেন। এটা অনুচিত। যখন বছর পূর্ণ হবে, তখনই যাকাত আদায় করা উচিত।
হ্যাঁ, যদি কারোর নেসাবের মালিক হওয়ার তারিখ মনে না থাকে, তাহলে তিনি একটি তারিখ ঠিক করে নেবেন এবং এরপর প্রতি বছর সে তারিখেই যাকাত আদায় করবেন।
অনেকেই আবার যাকাতকে রমযানের আমল মনে করেন। তাদের ধারণা, যাকাত রমযানেই আদায় করতে হয়। এ ধারণাও ভুল। নেসাবের মালিক হওয়ার পর থেকে যেদিন বছর পূর্ণ হবে, সেদিনই যাকাত আদায় করা ফরয হবে। এর সঙ্গে রমযানের সম্পর্ক নেই।
বছর যে দিন পূর্ণ হবে, সেদিনের সম্পদের মূল্য হিসেবেই যাকাত দিতে হবে। যাকাত আদায়ে কেউ যদি বিলম্ব করে, তবুও ঐ দিনের মূল্য হিসেবেই যাকাত আদায় করতে হবে, যাকাত আদায়ের সময় তার সম্পদের মূল্য কম-বেশি যা-ই হোক না কেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা হাদীস ১০৫৫৯
যাকাতের বছর গণনার ক্ষেত্রে ইংরেজি (সৌর) নয়, বরং আরবী (চন্দ্র) বছর অনুসরণ করতে হবে।
যাকাত আদায়ের নিয়ত
- যাকাত আদায়ের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। নিয়ত ছাড়া যাকাত দিলে তা আদায় হবে না। আবার লোক-দেখানো বা সামাজিক প্রতিপত্তি লাভের উদ্দেশ্যে যাকাত দিলেও তা কবুল হবে না। একমাত্র আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্ট করার জন্যেই যাকাত দিতে হবে।
- যাকাত দেওয়ার সময় মনে মনে যাকাতের নিয়ত থাকলেই চলবে। আবার নিজের সম্পদ থেকে যাকাতের টাকা পৃথক করে রাখলে পৃথক করার সময় নিয়ত করলেই চলবে। গরীব-মিসকিনকে দেয়ার সময় নতুন করে নিয়ত না করলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। -রদ্দুল মুহতার ২/২৬৮
- যাকাতের টাকা আলাদা করে রাখলেও জরুরি প্রয়োজনে তা ব্যয় করা যাবে, তবে পরে পুনরায় যাকাত দেওয়ার সময় নিয়ত করতে হবে।
- যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত কাউকে কোনো সম্পদ দান করার সময় যাকাতের নিয়ত করা হয় নি, কিন্তু গ্রহীতার হাতে ঐ টাকা থাকা অবস্থায় পরে নিয়ত করা হলো, এতে যাকাত আদায় হবে। গ্রহীতা খরচ করে ফেলার পর নিয়ত করলে তা যাকাত হিসেবে গণ্য হবে না। এমন কোনো ব্যক্তিকে যাকাতের নিয়ত ছাড়া কোনো খাদ্যদ্রব্য দেয়া হলে, পরবর্তীতে লোকটির হাতে তা থাকা অবস্থায় যদি যাকাতের নিয়ত করা হয়, তবুও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। টাকা খরচ করা কিংবা খাদ্যদ্রব্য বিক্রি বা খেয়ে ফেলার পর যাকাতের নিয়ত করলে হবে না। – আদ্দুররুল মুখতার ২/২৬৮
- যাকাতের টাকা আলাদা করে রাখার পর যদি তা চুরি হয়ে যায় বা হারিয়ে যায়, তবে যাকাত আদায় হবে না। পুনরায় দিতে হবে। -মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক হাদীস ৬৯৩৬; রদ্দুল মুহতার ২/২৭০
যাকাত আদায়ের হিসাব ও পদ্ধতি
- মোট সম্পদের ৪০ ভাগের এক ভাগ (২.৫%) যাকাত দেওয়া ফরয। যাকাত হিসেবে নগদ টাকাও দেয়া যাবে কিংবা সমমূল্যের কাপড় বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সামগ্রীও কিনে দেয়া যাবে। -সুনানে আবু দাউদ হাদীস ১৫৭০; মুসান্নাফে আবদুর রাযযাক ৭১৩৩
- স্বেচ্ছায় ফরয পরিমাণের চেয়ে বেশি যাকাত আদায় করলে কোনো সমস্যা নেই, বরং এতে অতিরিক্ত সওয়াব পাওয়া যাবে। -মুসনাদে আহমদ ২০৭৭
- যাকাত দেওয়ার সময় গ্রহীতাকে এটি ‘যাকাত’ তা বলার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজনে ‘হাদিয়া’ বা উপহার বলে দিলেও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। যাকাত দেয়ার সময় কিংবা যাকাতের টাকা পৃথক করে রাখার সময় দাতার নিয়ত থাকলেই চলবে। -রদ্দুল মুহতার ২/২৬৮
- কেউ যদি অন্য কারোর পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করতে চায়, তাহলে অবশ্যই যার যাকাত, তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি না নিলে যাকাত আদায় হবে না। পরিবারের কোনো সদস্যের যাকাত আদায় করতে হলেও এ অনুমতি নিতে হবে। যেমন, স্বামী যদি স্ত্রীর কিংবা ছেলে যদি বাবার যাকাত আদায় করতে চায়। যদি আগে থেকেই অনুমতি থাকে তাহলে যাকাত আদায়ের সময় নতুন করে অনুমতি নিতে হবে না। আর আগে অনুমতি নেয়া ছাড়াই যদি অন্য কারোর পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করা হয় এবং যাকাতের টাকা গ্রহীতার হাতে থাকা অবস্থাতেই অনুমতি পাওয়া যায়, তবুও যাকাত আদায় হয়ে যাবে। অন্যথায় যাকাত আদায় হবে না। যাকাত পুনরায় আদায় করতে হবে।
- যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত কোনো ব্যক্তি যদি ঋণগ্রস্ত হয় এবং পাওনাদার যদি যাকাতের নিয়তে সে ঋণ মাফ করে দেয় তাতে যাকাত আদায় হবে না। নিয়ম হলো, তাকে প্রথমে যাকাতের টাকা দেওয়া এবং এরপর সেই টাকা থেকে নিজের পাওনা উসুল করে নেওয়া। এই ব্যক্তি বা তার মনোনীত প্রতিনিধিকে যাকাতের টাকা দিয়ে পরে তার কাছ থেকে সেই টাকা নিজ পাওনা বাবদ নিয়ে নেওয়া যেতে পারে। -আদ্দুররুল মুখতার ২/২৭০; রদ্দুল মুহতার ২/২৭১
- ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণমুক্ত করার উদ্দেশ্যে তাকে যাকাতের টাকা দেওয়া উত্তম। আর কেউ যদি যাকাত গণ্য করা ছাড়াই ঋণ মাফ করে দেয়, তবে তো অনেক ভালো। -সূরা বাকারা, আয়াত ২৮০
- ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে পণ্যগুলোর বাজারমূল্য হিসাব করতে হবে, ক্রয়মূল্য নয়। অর্থাৎ নেসাবের বছর পূর্ণ হওয়ার দিন সবগুলো পণ্য একসঙ্গে বিক্রি করে দিলে যতটাকা পাওয়া যাবে, ততটাকারই যাকাত আদায় করতে হবে। পণ্যগুলোর ক্রয়মূল্য এখানে বিবেচ্য নয়।
অনলাইনে মুসলিমস ডে’র যাকাত ক্যালকুলেটরের মাধ্যমেও আপনার যাকাতের হিসাব করতে পারেন।
Leave a Reply