Press ESC to close

আনসার: ভালোবাসার যে মানদণ্ড আর কেউ ছুঁতে পারেনি—আনসার সিরিজ-০১

Post Updated at 18 May, 2026 – 2:46 PM

একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস কী? হয়তো আপনার বাড়ি। হয়তো ব্যাংক ব্যালেন্স। হয়তো আপনার স্ত্রী-সন্তান। এখন কেউ যদি বলে— “তোমার এই প্রিয় জিনিসটি আমাকে দিয়ে দাও” —আপনি কি পারবেন?

বেশিরভাগ মানুষ পারবেন না। আমি-আপনিও সম্ভবত পারতাম না। কিন্তু চৌদ্দশো বছর আগে মদিনায় একদল মানুষ ছিলেন—যারা পেরেছিলেন। শুধু পেরেছিলেন না—হাসিমুখে পেরেছিলেন। তারা হলেন আনসার। সাহায্যকারী।

সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

৬২২ খ্রিষ্টাব্দ। মক্কার মুসলমানদের উপর নির্যাতন তখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ঘরবাড়ি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নির্দেশে তারা হিজরত করলেন — সব পেছনে ফেলে, শুধু ঈমান বুকে নিয়ে। গন্তব্য: মদিনা।

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
আনসার হতে ক্লিক করুন

মক্কার মুসলমানরা যখন তাদের সর্বস্ব হারিয়ে মদীনায় এলেন—যখন তাদের মাথার ওপর না আশ্রয় ছিল, না পেটে খাবার ছিল, যখন তারা অসহায়ত্বের চরম সীমায় উপস্থিত—তখন আনসাররা তাদেরকে এমনভাবে বরণ করেছিলেন, যেন তারা তাদেরই সন্তান। তাদেরই ভাই।

আনসার — সাদের (রা) সেই অবিশ্বাস্য প্রস্তাব

সাদ ইবনে রাবি’ (রা.) তাঁর মুহাজির ভাই আব্দুর রহমানকে বললেন—

ভাই, আমার যা সম্পদ আছে আজ থেকে তার অর্ধেক তোমার। আমার বাগানের অর্ধেক তোমার। ও হ্যাঁ, আমার তো দু’জন স্ত্রী। বলো তোমার কাকে পছন্দ? আমি তাকে তালাক দিয়ে দিচ্ছি তুমি তাকে বিয়ে করে নাও।

 

— সুনানে নাসায়ী: হাদিস নং ৩৩৮৮ | মুসনাদে আহমাদ: হাদিস নং ১৩৮১৬

কিন্তু আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.) কী করলেন জানেন? বললেন — “ভাই, তোমার সম্পদে আমার প্রয়োজন নেই। শুধু বলো — এখানে বাজার কোথায়?”

পরদিন সকালে তিনি বাজারে গেলেন। নিজের পায়ে দাঁড়ালেন।

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন

এই দৃশ্যটা ভাবুন একবার — একজন মানুষ সব দিতে চাইছেন, আরেকজন নিতে অস্বীকার করছেন। দুইজনের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছে — কে বেশি মহৎ হবেন। ইতিহাসে এমন প্রতিযোগিতা বিরল।

আনসাররা তাদের মুহাজির ভাইদের জন্য ঠিক এভাবেই নিজেদের ঘর ভাগ করে দিয়েছিলেন, রুটি ভাগ করে দিয়েছিলেন, এমনকি হৃদয়ের ভেতরের শেষ প্রশস্ত জায়গাটুকুও। পৃথিবীর ইতিহাসে আতিথেয়তার বহু নজির আছে, কিন্তু আনসারদের মতো করে কেউ নিজের সুখকে অন্যের প্রাপ্য বানিয়ে দিতে পারেনি।

ইসার — যে শব্দের বাংলা নেই

আরবিতে এই মানসিকতার একটা নাম আছে — “ইসার।” অর্থ: নিজে কষ্টে থেকেও অন্যকে আগে রাখা। নিজের প্রয়োজনের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে বড় মনে করা।

সাধারণ মানুষ দান করে উদ্বৃত্ত থেকে। আনসাররা দিয়েছিলেন ঘাটতি থেকে। এই পার্থক্যটুকুই তাদের ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।

আল্লাহ ﷻ যখন নিজে প্রশংসা করলেন

তাদের এই নজিরবিহীন ভালোবাসা এবং আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখে আল্লাহ ﷻ এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে—তিনি তাদের প্রশংসা করে কুরআনের আয়াত নাজিল করেছিলেন—

“নিজেরা অভাবগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের উপর অন্যদের প্রাধান্য দেয়।” — সূরা হাশর, আয়াত ৯

এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবারা কেঁদেছিলেন।

একটু ভাবুন — আল্লাহ ﷻ কুরআনে অনেক নবী-রাসুলের কথা বলেছেন। অনেক ঘটনার কথা বলেছেন। কিন্তু এই মদিনার সাধারণ মানুষগুলোর কথা তিনি এমনভাবে বললেন — যেন তিনি তাদের কাজে মুগ্ধ হয়েছেন। চৌদ্দশো বছর পরেও সেই প্রশংসা মুছে যায়নি। যাবেও না।

রাসুল ﷺ-এর সাথে সেই অটুট বন্ধন

ভালোবাসার এক মহাজাগতিক নিয়ম হলো—এই ঋণের কোনো পার্থিব বিনিময় নেই; হৃদয়ের ঋণ কেবল হৃদয়ের অর্পণ দিয়েই মেটাতে হয়। আল্লাহ ﷻ, তাঁর দ্বীন এবং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি মদীনার আনসারদের এই যে এক বিবাগী ও অকৃত্রিম প্রেম, তা প্রিয় নবীজি ﷺ-কে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে, তিনি স্বয়ং তাঁদের ভালোবাসার এক চিরন্তন প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিলেন।

আনসারদের প্রতি নবীজির ﷺ এই টান কেবল কৃতজ্ঞতা ছিল না, বরং তা ছিল এক স্বর্গীয় বন্ধন। তাই তো তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন—

“আনসারদের প্রতি ভালোবাসাই হলো ঈমানের কষ্টিপাথর।” — সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ১৭

কারণ, আনসাররা তো কেবল ইসলামকে বরণ করেননি; বরং ইসলাম যখন মক্কার তপ্ত বালুতে আশ্রয় খুঁজছিল, তাঁরা তখন নিজেদের হৃদয়ের গহীন কুঠুরিতে সেই দ্বীনকে এক নিরাপদ বসতভিটা দিয়েছিলেন।

উহুদের সেই আনসার নারী

রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আনসারদের ভালোবাসা শুধু পুরুষদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

উহুদের যুদ্ধে এক আনসার নারী ছুটে বের হলেন যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে। পথে শুনলেন তাঁর স্বামী শহীদ হয়েছেন। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দিতে এলে তিনি একটাই প্রশ্ন করলেন — “রাসুলুল্লাহ ﷺ কেমন আছেন?”

তারপর শুনলেন তাঁর ভাই শহীদ হয়েছেন। আবার সেই একই প্রশ্ন। তারপর শুনলেন তাঁর বাবাও শহীদ। তখনও সেই একটাই প্রশ্ন — “রাসুলুল্লাহ ﷺ কেমন আছেন?”

অবশেষে যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে সামনে দেখলেন — বললেন,

“ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি ভালো আছেন — এরপর আর কোনো মুসিবত নেই।”

স্বামী, ভাই, বাবা — সবাইকে হারিয়েছেন। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে তখনও একটাই ভয় — নবীজি ﷺ ঠিক আছেন তো? এই ভালোবাসার নাম কী রাখবেন?

হুনাইনের যুদ্ধ ও সেই অমর বাক্য

হুনাইনের যুদ্ধের পর এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। যুদ্ধে বিজয়ের পর বিপুল গনিমতের মাল বণ্টন করা হচ্ছিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ নও মুসলিমদের বেশি বেশি সম্পদ দিচ্ছিলেন, যেন ইসলামের প্রতি তাদের ভালোবাসা ও অনুগত্য বৃদ্ধি পায়। আনসারদের কেউ কেউ তখন কষ্ট পেলেন—তারা ভাবলেন, ‘যুদ্ধে আমরা ছিলাম সবার আগে, অথচ যখন সম্পদ বণ্টন হচ্ছে তখন আমরাই রইলাম পিছিয়ে!’

এটা আসলে তাদের দোষ নয়, মানুষের স্বাভাবিক আবেগ কখনো কখনো ধুলোমাখা পৃথিবীর ক্ষুদ্র প্রাপ্তির মোহে ক্ষণিকের জন্য হলেও পথ হারায়।

খবরটি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছালে তিনি আনসারদের একত্র করলেন। তারপর এমন কথা বললেন, যা শুনে কঠিন হৃদয়ও গলে যায়।

“হে আনসাররা! তোমরা কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, মানুষ যখন উট আর মেষের পালের মতো এই ধূলিময় পার্থিব সম্পদের বোঝা নিয়ে ঘরে ফিরবে, আর তোমরা তোমাদের ঘরের আঙিনায় স্বয়ং আল্লাহর রাসুলকে সঙ্গে নিয়ে ফিরবে?” — সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৪৩৩০

তিনি ﷺ আরো বললেন:

“সারা পৃথিবীর মানুষ যদি এক উপত্যকা দিয়ে হাঁটে আর আনসাররা অন্য কোনো দুর্গম উপত্যকা বেছে নেয়, তবে আমি কেবল আনসারদের পথেই পা বাড়াব।” — সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ১০৫৯

এই কথা শুনে আনসাররা কেঁদে ফেললেন। এত কান্না যে তাঁদের দাড়ি ভিজে গেল। পার্থিব সম্পদ নেই — কিন্তু নবীজি ﷺ তাঁদের। এটুকুই তাঁদের জন্য যথেষ্ট।

মক্কা বিজয়ের পর আনসার সাহাবীগণের আশংকা

মক্কা বিজয়ের পর সকল মুহাজির সাহাবীগণ যখন আনন্দে উৎফুল্ল, আনসার সাহাবীগণ তখন এই বিষয়টি ভেবে বিষণ্ণ:

“আল্লাহর রাসূল ﷺ তাঁর জন্মভূমি মক্কাকে ফিরে পেয়েছেন। তিনি কি এখন এখানেই থেকে যাবেন? আমাদের সাথে কি তিনি আর মদীনায় থাকবেন না? আমরা কি নবীজির ﷺ সান্নিধ্য হারিয়ে ফেললাম?”

নবীজি ﷺ যখন তাদের এই আশংকার কথা জানতে পারলেন। তখন তিনি আনসারদের ভালোবাসার প্রতিদানে বললেন যে, তিনি আমৃত্যু মদীনায় আনসারদের সাথেই থাকবেন!

কী আশ্চর্য প্রেম! পৃথিবীর মানুষ যেখানে স্বর্ণ মাপে পাল্লায়, সেখানে আনসাররা মেপেছিলেন ভালোবাসা দিয়ে। তাই তো আজও ইতিহাসের পাতা উল্টালে মনে হয়, আনসাররা বুঝি মানুষ ছিলেন না; তারা ছিলেন দয়ার ভাষায় লেখা আল্লাহর এক অপূর্ব কবিতা।

আনসার সিরিজের পরের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।

Enamul Haque Ibn Yousuf

“এনামুল হক ইবনে ইউসুফ" সমসাময়িক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের একজন সুপরিচিত কণ্ঠস্বর। জীবন, সম্পর্ক, আধ্যাত্মিকতা ও মানবমনের গভীর অনুভূতিগুলোকে তিনি কাব্যিক অথচ বাস্তব ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ "জোড়াতালির সংসার" এবং "জীবনের ভাঁজে ভাঁজে" পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত। উপন্যাসের পাশাপাশি অনুকাব্য, অনুগল্প ও দার্শনিক গদ্যেও তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব এক সাহিত্যভুবন।

Comments (2)

  • মোঃ বুলবুল আহমেদ বোরহানsays:

    May 27, 2026 at 4:14 AM

    মাশাআল্লাহ ! খুবই হৃদয়গ্রাহী ও মনোমুগ্ধকর । আল্লাহ আপনাকে আরো ইসলামের পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করুন। আমিন।

  • Johirul Islam Shaddumsays:

    June 14, 2026 at 6:51 PM

    Alhamdulillah… Feel like “serenity” after reading about their dedication. The chosen of words was amazing.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

- আমি মুসলিমস ডে এর কমেন্টের নীতিমালার সাথে একমত হয়ে পোস্ট করছি

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন ২

ট্যাগ সমূহ

সাইট হিট কাউন্টার

সর্বমোট পোস্ট ভিউ: ৫,২১৪,৩১৩

পোস্ট কপি করার অপশন বন্ধ রাখা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পোস্টের লিংক কপি করুন