Press ESC to close

হিজরতের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ : ইয়াসরিব যখন ‘মদিনাতুন নবী’ —আনসার সিরিজ-০৬

আকাবার সেই রুদ্ধশ্বাস শপথের পর মদিনার প্রতিটি অলিগলিতে এক অভূতপূর্ব ও পবিত্র ব্যাকুলতা ছড়িয়ে পড়ল। ইয়াসরিবের প্রতিটি মুসলিম পরিবার তখন এক নতুন ভোরের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। আনসাররা জানতেন, তাঁরা কেবল আরবের কোনো সাধারণ নেতাকে বরণ করতে যাচ্ছেন না, বরং তাঁরা বরণ করতে যাচ্ছেন বিশ্বজগতের মুক্তির দিশারিকে।

আনসার সিরিজের আগের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন

অন্যদিকে, মক্কার বাতাস তখন কুরাইশদের হিংসা আর ক্রোধে ভারী হয়ে উঠেছিল। তারা যখন দেখতে পেল যে, তাদের সব চক্রান্ত ব্যর্থ করে ইসলাম মদিনার নিরাপদ মাটিতে ডালপালা মেলছে, তখন তারা চরম আতঙ্কে ভুগতে শুরু করল। তারা বুঝতে পারল, মুহাম্মদ ﷺ একবার মদিনায় পৌঁছে একটি সুসংগঠিত ঘাঁটি তৈরি করলে কুরাইশদের বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। এই আতঙ্কই তাদের তাড়িত করল এক পৈশাচিক সিদ্ধান্তের দিকে।

১. হিজরতের সবুজ সংকেত ও সাহাবীদের মহানিষ্ক্রমণ

নবুয়তের তেরোতম বছরে নবীজি ﷺ যখন সাহাবীদের হিজরতের অনুমতি দিলেন, তখন মক্কায় শুরু হলো এক মহাকাব্যিক ত্যাগ। অনিশ্চিতের পথে সেই যাত্রা ছিল ইমানের এক চরম পরীক্ষা।

  • আবু সালামাহ (রা.)-এর বিরহ: হিজরতের প্রথম কাফেলাটি ছিল আবু সালামাহ (রা.)-এর। তিনি যখন তাঁর স্ত্রী উম্মে সালামাহ এবং দুগ্ধপোষ্য সন্তানকে নিয়ে রওনা হলেন, তখন তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাঁর স্ত্রীকে জোরপূর্বক কেড়ে নিল। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আবু সালামাহর নিজের গোত্রের লোকেরা তাঁর সন্তানকে কেড়ে নেয়। এক নিমেষেই একটি সাজানো সংসার তছনছ হয়ে গেল। আবু সালামাহ (রা.) বুকের ভেতর বিচ্ছেদের আগুন চেপে রেখে একাকী মদিনার পথে পা বাড়ালেন।
  • সুহাইব রুমি (রা.)-এর নিঃস্বার্থ সওদা: সুহাইব রুমি (রা.) যখন মক্কা ত্যাগ করতে চাইলেন, তখন কুরাইশরা তাঁর পথরোধ করে তাঁর সমস্ত সম্পদ মক্কাতেই রেখে যাওয়ার শর্ত দিল। সুহাইব (রা.) মুহূর্তকাল দেরি না করে তাঁর জীবনের সব সঞ্চয় কুরাইশদের হাতে তুলে দিয়ে কেবল ইমানটুকু সম্বল করে রওনা হলেন। তাঁর এই ত্যাগের খবর শুনে নবীজি ﷺ বলেছিলেন, “সুহাইব এক লাভজনক ব্যবসা করেছে!”
  • উমর (রা.)-এর বীরত্বগাথা: যেখানে সবাই গোপনে মক্কা ছাড়ছিলেন, সেখানে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তলোয়ার হাতে কাবার সামনে দাঁড়িয়ে গর্জন করে বললেন, “কার মা চায় তার সন্তান এতিম হোক? সে যেন আজ এই উপত্যকার পেছনে আমার পথ আটকায়!” কারো সাহস হলো না তাঁর পথ আগলে দাঁড়ানোর। ২০ জন দুর্বল সাহাবীকে সাথে নিয়ে তিনি বীরদর্পে মদিনার পথে পা বাড়ালেন।

২. দারুন নদওয়ার সেই রক্তক্ষয়ী ষড়যন্ত্র

নবুয়তের তেরোতম বছর, ২৬শে সফর। মক্কায় তখন নবীজি ﷺ, আবু বকর (রা.) এবং আলী (রা.) ছাড়া প্রায় সব সাহাবী হিজরত করে চলে গেছেন। কুরাইশরা তাদের বাণিজ্যিক আধিপত্য রক্ষার শেষ চেষ্টা হিসেবে মক্কার কুখ্যাত সভাগৃহ ‘دار الندوة’ (দারুন নদওয়া)-তে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হলো। সীরাতকারদের বর্ণনা অনুযায়ী, সেই বৈঠকে শয়তান নিজে এক প্রবীণ নজদীয়ার ছদ্মবেশে উপস্থিত হয়ে কুরাইশদের কু-পরামর্শ দিতে থাকে।

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
আনসার হতে ক্লিক করুন

বৈঠকে আবু জাহেল সেই পৈশাচিক প্রস্তাবটি পেশ করল। সে বলল:

“প্রতিটি গোত্র থেকে একজন করে অকুতোভয় ও শক্তিশালী যুবক নির্বাচন করো। তারা সবাই মিলে একযোগে মুহাম্মদকে তাঁর নিজ ঘরে আক্রমণ করে হত্যা করবে। এতে করে তাঁর রক্ত সব গোত্রের ওপর ছড়িয়ে পড়বে এবং তাঁর গোত্র বনু হাশিম একা সমগ্র আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সাহস পাবে না। নিরুপায় হয়ে তারা কেবল রক্তপণ গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হবে।”

কুরাইশরা এই ঘৃণ্য প্রস্তাবে একমত হয়ে তাদের শ্রেষ্ঠ ঘাতক যুবকদের নবীজি ﷺ-এর ঘরের চারপাশ ঘিরে ফেলার নির্দেশ দিল।

৩. আলীর (রা.) আত্মত্যাগ ও গারে সাওরের অলৌকিক তিন রাত

কুরাইশদের সেই ঘাতক যুবকেরা যখন নগ্ন তলোয়ার হাতে ঘর ঘিরে রেখেছিল, তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে নবীজি ﷺ হিজরতের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে মক্কাবাসীদের অনেক আমানত গচ্ছিত ছিল।

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন

তিনি আলী (রা.)-কে ডেকে বললেন,

“আলী, তুমি আজ আমার বিছানায় আমার এই সবুজ চাদরটি মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকো। কুরাইশরা ভাববে আমি ঘরেই আছি। তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”

নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে নবীজির বিছানায় শুয়ে পড়ার এই সিদ্ধান্ত ছিল আলী (রা.)-এর অসীম বীরত্ব ও ভালোবাসার এক অমর গাথা।

রজনীর শেষ প্রহরে নবীজি ﷺ সূরা ইয়াসীনের ৯ম আয়াত—“আর আমি তাদের সামনে ও পেছনে প্রাচীর স্থাপন করেছি…” তিলাওয়াত করে এক মুঠো ধুলো ঘাতকদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে তাদের চোখের সামনে দিয়েই বেরিয়ে গেলেন। আল্লাহর কুদরতে তারা অন্ধ হয়ে রইল। নবীজি ﷺ সোজা চলে গেলেন আবু বকর (রা.)-এর ঘরে। সেখান থেকে তাঁরা রাতের অন্ধকারেই ‘সাওর’ পর্বতের এক দুর্গম গুহার দিকে রওনা হলেন।

গুহার সেই তিন দিন ছিল ইতিহাসের এক রুদ্ধশ্বাস অধ্যায়। কুরাইশরা যখন গুহার একদম মুখ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, আবু বকর (রা.) তখন উদ্বেগের সাথে ফিসফিস করে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল! তারা যদি তাদের পায়ের দিকে একবার তাকায়, তবেই আমাদের দেখে ফেলবে।” নবীজি ﷺ তখন তাঁকে আশ্বস্ত করে বললেন, “চিন্তা করো না আবু বকর, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।” (সূরা তাওবাহ: ৪০)। ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহর কুদরতে গুহার মুখে মাকড়সা জাল বুনে দিল এবং একটি বুনো কবুতর বাসা বেঁধে বসে রইল। কুরাইশরা ভাবল, এখানে যদি মানুষ থাকত তবে মাকড়সার জাল অক্ষত থাকত না। তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেল।

৪. সুরাকা ইবনে মালিকের পরাজয় ও মদিনায় নতুন ভোরের সূর্যোদয়

গুহা থেকে বের হওয়ার পর নবীজি ﷺ এবং আবু বকর (রা.) যখন মদিনার পথে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন মক্কার কুরাইশরা তাঁদের ধরার জন্য একশত উটের পুরস্কার ঘোষণা করল। এই লোভে সুরাকা ইবনে মালিক নামক এক দুর্ধর্ষ ঘোড়সওয়ার তাঁদের ধাওয়া করল। সে যখনই নবীজি ﷺ-এর একদম কাছে আসছিল, তখনই আল্লাহর কুদরতে তার ঘোড়ার পা বালুর ভেতর গেঁথে যাচ্ছিল। তিনবার এমন অলৌকিক বাধার সম্মুখীন হওয়ার পর সুরাকা ক্ষমা চাইল এবং নবীজি ﷺ তাকে ভবিষ্যৎবাণী করলেন যে, একদিন সুরাকা পারস্য সম্রাটের স্বর্ণের চুড়ি পরবে।

অন্যদিকে মদিনায় তখন আনসারদের অবস্থা ছিল বর্ণনাতীত। তাঁরা প্রতিদিন প্রখর রোদ আর মরুভূমির লু-হাওয়া সহ্য করে মক্কার পথের দিকে তাকিয়ে থাকতেন।

৮ই রবিউল আউয়াল, সোমবার। এক ইহুদি ব্যক্তি দূর দিগন্তে ধূলি উড়িয়ে আসা এক কাফেলা দেখে চিৎকার করে উঠল, “হে আরবের লোকসকল! তোমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত নসীব এসে গেছে!” মদিনার প্রতিটি ঘরে ঘরে তখন খুশির জোয়ার বয়ে গেল। আনসাররা তলোয়ার আর ঢাল হাতে নিয়ে সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে নবীজিকে ﷺ বরণ করতে দৌড়ে এলেন। পুরো মদিনার আকাশ-বাতাস ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল।

৫. কুবাতে প্রথম পদার্পণ ও ইসলামের প্রথম মসজিদ

মদিনার উপকণ্ঠ ‘কুবা’ ছিল নবীজি ﷺ-এর হিজরতের প্রথম বিশ্রামস্থল। সেখানে তিনি চৌদ্দ দিন অবস্থান করেন। এই সংক্ষিপ্ত অবস্থানকালেই তিনি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদ ‘মসজিদে কুবা’ নির্মাণ করেন, যার ভিত্তিপ্রস্তর তিনি নিজ হাতে স্থাপন করেছিলেন। আনসার সাহাবীরা যখন একেকটি ভারী পাথর বহন করছিলেন, তখন নবীজি ﷺ নিজেও তাঁদের সাথে সাধারণ শ্রমিকের মতো পাথর কাঁধে নিয়ে কাজ করছিলেন।

৬. আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)-এর মহিমান্বিত মেহমানদারি

কুবা থেকে যখন নবীজি ﷺ মদিনার মূল শহরের দিকে রওনা হলেন, তখন প্রতিটি আনসার গোত্র রাজপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। প্রতিটি গোত্রপ্রধান নবীজির উটনীর লাগাম ধরে আরজ করছিলেন আমাদের এখানে অবস্থান করার জন্য। নবীজি ﷺ নম্রভাবে বলছিলেন, “তোমরা উটনীটিকে ছেড়ে দাও, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে আদিষ্ট। এটি যেখানে থামবে, সেখানেই হবে আমার আবাস।”

উটনীর চলার পথে মদিনার ছোট ছোট মেয়েরা দফ বাজিয়ে সেই ঐতিহাসিক গজলটি গাইছিল—

“তালা আল বাদরু আলাইনা, মিন সানিয়াতিল ওয়াদা…”

(বিদা পাহাড়ের আড়াল থেকে পূর্ণিমা চাঁদ আমাদের মাঝে উদিত হয়েছে…)

উটনীটি অবশেষে বনু নাজ্জার গোত্রের দুই এতিম বালকের জমির সামনে গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে বসল। ঠিক সেই সময় আবু আইয়ুব আনসারী (রা.) অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে নবীজির আসবাবপত্রগুলো নিজের কাঁধে তুলে দ্রুত তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন। নবীজি ﷺ মৃদু হেসে বললেন, “মানুষ তার আসবাবপত্রের সাথেই থাকে।”

আবু আইয়ুব আনসারী (রা.)-এর সেই সাধারণ মাটির ঘরটিই হয়ে উঠল বিশ্বনবী ﷺ-এর মদিনার প্রথম আশ্রয়স্থল। ইয়াসরিবের তপ্ত মরুভূমি প্রিয় নবীজি ﷺ-এর আগমনে শীতল ও নূরানী হয়ে উঠল। ইয়াসরিবের অন্ধকার নাম মুছে গিয়ে তা হয়ে গেল ‘মদিনাতুর রাসুল’ বা নবীর শহর।

[আনসার সিরিজের পরের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে।]

📚 গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র 

১. সীরাত ইবনে হিশাম: ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৫০-৪৫১, ৪৬৮-৪৬৯, ৪৭৭।

২. আর-রাহীকুল মাখতূম: সফিউর রহমান মোবারকপুরী, পৃষ্ঠা ১৪৩-১৪৫, ১৪৭-১৪৯, ১৫৭-১৬০।

৩. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৮৮।

৪. সহীহ বুখারী: হাদিস নং ৩৯০৬ (হিজরত অধ্যায়)।

৫. তারীখে দামেশক: ইবনে আসাকির (সুহাইব রুমি রা. ও উমর রা.-এর হিজরত প্রসঙ্গ)।

Enamul Haque Ibn Yousuf

“এনামুল হক ইবনে ইউসুফ" সমসাময়িক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের একজন সুপরিচিত কণ্ঠস্বর। জীবন, সম্পর্ক, আধ্যাত্মিকতা ও মানবমনের গভীর অনুভূতিগুলোকে তিনি কাব্যিক অথচ বাস্তব ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ "জোড়াতালির সংসার" এবং "জীবনের ভাঁজে ভাঁজে" পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত। উপন্যাসের পাশাপাশি অনুকাব্য, অনুগল্প ও দার্শনিক গদ্যেও তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব এক সাহিত্যভুবন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

- আমি মুসলিমস ডে এর কমেন্টের নীতিমালার সাথে একমত হয়ে পোস্ট করছি

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন ২

ট্যাগ সমূহ

সাইট হিট কাউন্টার

সর্বমোট পোস্ট ভিউ: ৫,১৬৩,২১২

পোস্ট কপি করার অপশন বন্ধ রাখা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পোস্টের লিংক কপি করুন