Press ESC to close

আকাবার সেই নিশীথ শপথ: আঁধারের বুক চিরে আলোর আহ্বান—আনসার সিরিজ-০৩

Post Updated at 21 Jun, 2026 – 12:00 PM

মক্কার রুক্ষ, ধূসর পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে তখন জমাট বেঁধেছে এক নিরেট ও দুর্ভেদ্য অন্ধকার। আরবের আকাশে নক্ষত্ররা যেন অন্যদিনের চেয়েও বেশি উজ্জ্বল, স্পন্দিত এবং রহস্যময়; যেন তারা অপলক হিরণ্ময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মক্কার অদূরে অবস্থিত এক অতি সংকীর্ণ, দুর্গম ও ছায়াবৃত গিরিপথ—’আকাবা’র দিকে।

আনসার সিরিজের আগের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

সময়টি ছিল হজের উত্তপ্ত মৌসুম। আরবের বিভিন্ন ধূলিধূসর প্রান্তর থেকে উটের দীর্ঘ কাফেলাগুলো মক্কার মরুময় বুকে ভিড় জমিয়েছে। কাবা প্রাঙ্গণে তখন হাজীদের কলতানে মুখরতা, সরাইখানায় ভিনদেশি মুসাফিরদের ভিড় আর মক্কার প্রতিটি ধূলিকণায় এক আদিম উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই হাজারো মানুষের মিছিলের মাঝেও একদল মানুষ ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন, যাঁদের চলনে ছিল এক অদ্ভূত সতর্কতা এবং চোখে ছিল সুদূরপ্রসারী কোনো স্বপ্ন। তাঁরা ইয়াসরিব থেকে আসা সেই বারোজন সৌভাগ্যবান যুবক, যাঁদের অন্তরে ছিল শত বছরের গোত্রীয় কলহ ও রক্তক্ষয়ী ঘৃণা থেকে মুক্তির এক অবিনাশী তৃষ্ণা।

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
আনসার হতে ক্লিক করুন

তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন আসআদ ইবনে যুরারাহ, রাফে ইবনে মালিক এবং উবাদা ইবনুস সামিত (রা.)-সহ খাযরাজ ও আওস গোত্রের বেশ কয়েকজন বীর সন্তান। সেই রাতে মক্কার প্রতিটি সরু গলি আর পাহাড়ের বাঁকে কুরাইশদের সশস্ত্র প্রহরীরা শ্যেনদৃষ্টিতে টহল দিচ্ছিল। আবু জাহেল আর আবু লাহাবদের বিষাক্ত নজর এড়িয়ে কোনো এক অজানার পথে পা বাড়ানো ছিল নিশ্চিত আত্মহত্যার শামিল। কিন্তু এই বারোজন যুবকের হৃদয়ে তখন ভয়ের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিয়েছিল এক পরম সত্যের ডাক। তাঁরা নিশব্দে, ছায়ার মতো পাহাড়ের খাঁজ বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করলেন। মক্কার প্রতিটি নির্বাক পাথর যেন সাক্ষী হয়ে রইল পৃথিবীর গতিপথ বদলে দেওয়া এক ঐতিহাসিক পদযাত্রার।

১. গিরিপথের সেই মহিমান্বিত জ্যোতি

মক্কার সেই পাথুরে গিরিপথ ‘আকাবা’ তখন এক অপার্থিব নিস্তব্ধতায় ডুবে আছে। ইয়াসরিবের সেই যুবকরা যখন পাহাড়ের বাঁক পেরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছালেন, তখন তাঁরা দেখলেন এক সমাহিত ও কান্তিমান পুরুষকে। যেন যুগ যুগ ধরে তিনি তাঁদেরই প্রতীক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর নূরানি চেহারা মুবারক থেকে ঠিকরে বের হচ্ছিল এক স্বর্গীয় প্রশান্তি। তিনি আর কেউ নন, তিনি ছিলেন মানবতার মুক্তির শেষ দিশারি মুহাম্মদ ইবন আবদুল্লাহ ﷺ। আর তাঁর পাশে পাহাড়ের মতো অটল ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন তাঁর चाचा আব্বাস (রা.)।

নবীজি ﷺ কথা বলতে শুরু করলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল মখমলের মতো কোমল, অথচ তাতে ছিল এক অমোঘ কর্তৃত্ব। তিনি তাঁদের সামনে मेले ধরলেন আসমানি ঐশ্বর্যের চিরবিস্ময়কর সেই ঝুলি—তিলাওয়াত করতে শুরু করলেন সূরা আল-আন’আমের ১৫১ থেকে ১৫৩ নম্বর আয়াতগুলো:

“বলুন: এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের ওপর যা হারাম করেছেন তা পড়ে শুনাই। তা এই যে, তোমরা তাঁর সাথে কোনো কিছু শরিক করো না, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করো…”

নবীজি ﷺ-এর সুললিত ও গম্ভীর কণ্ঠে যখন এই বাণী ধ্বনিত হলো, তখন ইয়াসরিবের সেই যুবকদের হৃদযন্ত্রে যেন এক প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে গেল। যখন নবীজি ﷺ পড়ছিলেন—

সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন
সাদকায়ে জারিয়ায় অংশ নিতে ক্লিক করুন

“অভাবের কারণে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না—আমিই তোমাদের ও তাদের রিজিক দেই”,

তখন তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠল ইয়াসরিবের সেই অর্থহীন যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা আর দারিদ্র্যের হাহাকার। এই তিলাওয়াত তাঁদের হৃদয়ে গেঁথে থাকা শতাব্দী প্রাচীন শিরক আর গোত্রীয় হিংসার পচনশীল অংশগুলোকে উপড়ে ফেলছিল।

২. হৃদয়ের সেই ঐতিহাসিক রূপান্তর

যখন রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত সূরা আল-আন’আমের সেই বৈপ্লবিক আয়াতগুলোর প্রতিধ্বনি থামল, তখন সেখানে এক অপার্থিব নীরবতা নেমে এল। আসআদ ইবনে যুরারাহ এবং তাঁর সঙ্গীরা তখন পাথর হয়ে বসে রইলেন। ইয়াসরিবের তপ্ত বালুচরে যে বীরত্বের দম্ভ নিয়ে তাঁরা বড় হয়েছিলেন—আজ এই মুহূর্তে সেই সব দম্ভ এক চরম অসারতায় পর্যবসিত হলো।

ইহুডিরা যে নবীর ভয় দেখিয়ে তাঁদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চাইত, আজ সেই নবী স্বয়ং তাঁদের সামনে দাঁড়িয়ে জান্নাতের সুসংবাদ দিচ্ছেন। তাঁরা একজন একজন করে নবীজির পবিত্র ও স্নিগ্ধ হাতে নিজেদের রুক্ষ হাত রাখলেন। মরুভূমির সেই কঠোর ও تপ্ত হাতের সাথে দয়ার নবীর জান্নাতি স্পর্শের যে মিলন ঘটল, তা ছিল ইতিহাসের সেই সন্ধিক্ষণ যখন ধুলোর মানুষ আসমানের সাথে সন্ধি করে। তাঁদের কণ্ঠে তখন ধ্বনিত হলো সেই কালজয়ী ঘোষণা— “হে আল্লাহর রাসূল! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্য নবী এবং আপনার আনীত বাণীই পরম সত্য।” এই ঘোষণার সাথে সাথেই মক্কার সেই অন্ধকার গিরিপথে যেন এক অকাল ঊষার উদয় হলো।

৩. প্রথম বায়াত: এক নব্য জীবনের রাজকীয় অঙ্গীকার

ইতিহাসে এই শপথকে বলা হয় ‘প্রথম আকাবার বায়াত’—যা ছিল মূলত এক নব্য জীবনের রাজকীয় অঙ্গীকার। এই বায়াত কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক চুক্তি বা সামরিক জোট ছিল না; এটি ছিল এক আত্মিক বিপ্লবের ইশতেহার। নবীজি ﷺ তাঁদের হাত বাড়িয়ে দিতে বললেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থির কণ্ঠে শোনালেন সেই ঐতিহাসিক শর্তাবলি:

  • তাঁরা এক আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করবেন না।
  • অন্যের সম্পদে হাত দেবেন না অর্থাৎ চুরি বর্জন করবেন।
  •  চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষা করবেন অর্থাৎ ব্যভিচার ত্যাগ করবেন।
  • অভাবের ভয়ে নিজেদের সন্তানদের হত্যা করবেন না।
  • কারো প্রতি মিথ্যে অপবাদ দেবেন না।
  • জীবনের প্রতিটি সৎ ও ন্যায় কাজে নবীজির নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন।

যে সমাজে চুরি ছিল বীরত্ব, ব্যভিচার ছিল আভিজাত্য আর কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া ছিল সম্মানের প্রতীক—সেখানে এই শর্তগুলো মানা মানে ছিল পুরো সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে একাই দাঁড়িয়ে যাওয়া। আসআদ ইবনে যুরারাহ যখন নবীজির হাতে নিজের হাতটি রাখলেন, তখন তাঁর মনে পড়ল বুয়াসের সেই রক্তক্ষয়ী ময়দানের কথা। তিনি ভাবলেন, এতকাল তিনি তলোয়ারের হাতল ধরেছেন ভাই হত্যার নেশায়, আর আজ তিনি হাত রেখেছেন রহমতের নবীর হাতে—শান্তি আর সাম্যের শপথ নিতে।

৪. মুসআব ইবনে উমাইর (রা.): ইয়াসরিবের প্রথম মুক্তির দূত

বায়াত গ্রহণের পর ইয়াসরিবের যুবকরা যখন ফিরে যাওয়ার জন্য উটের লাগাম ধরলেন, তখন তাঁদের হৃদয়ে এক মিশ্র অনুভূতির দোলাচল। তাঁরা ভাবছিলেন, ইয়াসরিবের সেই তপ্ত মরুভূমিতে ফিরে গিয়ে তাঁরা কীভাবে এই নতুন জীবনের সুধা মানুষের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছাবেন? তাঁরা তো কেবল ইসলামের মৌলিক শর্তগুলোর ওপর শপথ নিলেন, কিন্তু পুরো কুরআন শেখানোর মতো প্রাজ্ঞ কেউ তো তাঁদের মাঝে নেই।

রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁদের এই অব্যক্ত ব্যাকুলতা মুহূর্তেই অনুধাবন করতে পারলেন। তিনি ইয়াসরিবের এই নতুন উর্বর জমিনে সঠিক একজন বীজ বপনকারীর প্রয়োজন অনুভব করলেন। তাই তিনি তাঁদের সাথে পাঠিয়ে দিলেন তরুণ সাহাবী মুসআব ইবনে উমাইর (রা.)-কে। মুসআব ছিলেন মক্কার এক কিংবদন্তি রাজপুত্র। যাঁর পোশাক আসত সুদূর ইয়েমেন থেকে, যাঁর শরীর একসময় রেশম ছাড়া কিছুই চিনত না। কিন্তু সত্যের প্রেমে তিনি নিজের সব বিলাসিতা বিসর্জন দিয়েছিলেন।

মুসআব যখন সেই ইয়াসরিবী কাফেলার সাথে মক্কার সীমান্ত পাড়ি দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর পরনে ছিল তালি দেওয়া এক টুকরো চামড়া বা খসখসে চট। কিন্তু মুসআবের চেহারায় তখন যে উজ্জ্বলতা ছিল, তা মক্কার কোনো প্রসাধনীতে ছিল না। তিনি সাথে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এক অবিনাশী আলোকবর্তিকা, যা ইয়াসরিবকে ‘মদিনাতুন নবী’ বা নবীর শহরে রূপান্তর করবে।

৫. মরুভূমির ধুলোয় ঈমানের সুঘ্রাণ ও প্রতীক্ষিত মহাবিপ্লব

কাফেলাটি যখন ইয়াসরিবের উপকণ্ঠে এসে পৌঁছাল, তখন শহরের প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন। এই জনপদটি ছিল এক শতাব্দী প্রাচীন ঘৃণা, রক্তপাত আর আধ্যাত্মিক পচনে জর্জরিত এক আগ্নেয়গিরি। আসআদ ইবনে যুরারাহ (রা.) তাঁর প্রশস্ত হৃদয়ের সবটুকু মমতা দিয়ে মক্কার এই মুসাফিরকে নিজের বাড়িতে অভ্যর্থনা জানালেন।

আসআদের বাড়ির সেই ছোট ঘরটিই হয়ে উঠল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সার্থ্যবান ‘দাওয়াত সেন্টার’। রাতের আঁধারে, যখন শহরের কোলাহল থিতিয়ে আসত, তখন শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ গোপনে আসতে শুরু করল এই সুদর্শন মক্কী যুবকের কাছে। মুসআব যখন তাঁদের সামনে বসে অত্যন্ত ধীরলয়ে বলতে শুরু করতেন যে—মানুষ মানুষের গোলাম নয়, একমাত্র মহান আল্লাহর বান্দা—তখন সেই কঠোরচিত্তের যোদ্ধাদের চোখ বেয়েও অজস্র অশ্রু ঝরতে লাগত।

আওস ও খাযরাজ গোত্রের সাধারণ মানুষের মাঝে এক অদ্ভূত রূপান্তর লক্ষ্য করা গেল। যারা একদিন তলোয়ার হাতে একে অপরের রক্তের সন্ধানে ঘুরত, আজ তাঁরা গোপনে একই স্থানে বসে এক রবের প্রশংসা করছে। ইয়াসরিব তখন দাঁড়িয়ে ছিল এক মহাপ্লাবনের অপেক্ষায়—যে প্লাবনটি কোনো ধ্বংস বয়ে আনবে না, বরং ধুয়ে মুছে সাফ করে দেবে শতাব্দী প্রাচীন পঙ্কিলতা। পুরনো দিন ফুরিয়ে আসছে, খুব শীঘ্রই এই জনপদ ‘মদিনাতুন নবী’র রাজকীয় মুকুট মাথায় परबे।

আনসার সিরিজের পরের পর্বটি পড়তে ক্লিক করুন এখানে

তথ্যসূত্র:

  • আর-রাহীকুল মাখতূম (শফিউর রহমান মোবারকপুরী)
  • আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ (ইবনে হিশাম)
  • আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া (ইবনে কাসীর)

Enamul Haque Ibn Yousuf

“এনামুল হক ইবনে ইউসুফ" সমসাময়িক বাংলা ইসলামি সাহিত্যের একজন সুপরিচিত কণ্ঠস্বর। জীবন, সম্পর্ক, আধ্যাত্মিকতা ও মানবমনের গভীর অনুভূতিগুলোকে তিনি কাব্যিক অথচ বাস্তব ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর বহুল আলোচিত গ্রন্থ "জোড়াতালির সংসার" এবং "জীবনের ভাঁজে ভাঁজে" পাঠকমহলে বিশেষভাবে সমাদৃত। উপন্যাসের পাশাপাশি অনুকাব্য, অনুগল্প ও দার্শনিক গদ্যেও তিনি নির্মাণ করে চলেছেন নিজস্ব এক সাহিত্যভুবন।

Comments (2)

  • Mehedi Hasansays:

    June 13, 2026 at 8:17 PM

    পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার চোখের সাসনেই বুঝি আকাবার সেই বায়াত গ্রহণ করছিল মদিনার সেই আনসার সাহাবিরা। হে আল্লাহ আমাকে মুসআব বিন উমায়ের (রা) ইসলাম কে আঁকড়ে ধরার তৌফিক দান করেন। আমিন

  • Mehedi Hasansays:

    June 13, 2026 at 8:19 PM

    পড়ার সময় মনে হচ্ছিল আমার চোখের সামনেই বুঝি আকাবার সেই বায়াত গ্রহণ করছিল মদিনার সেই আনসার সাহাবিরা। হে আল্লাহ আমাকে মুসআব বিন উমায়ের (রা) এর মতো ইসলাম কে আঁকড়ে ধরার তৌফিক দান করেন। আমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

- আমি মুসলিমস ডে এর কমেন্টের নীতিমালার সাথে একমত হয়ে পোস্ট করছি

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন ২

ট্যাগ সমূহ

সাইট হিট কাউন্টার

সর্বমোট পোস্ট ভিউ: ৫,২১৪,৩০৯

পোস্ট কপি করার অপশন বন্ধ রাখা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পোস্টের লিংক কপি করুন