Post Updated at 16 Jun, 2024 – 7:52 PM

পবিত্র ঈদ উল ফিতর এবং ঈদ উল আযহা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি উপহার। এ উপহারটি যেন আল্লাহর আনুগত্য করার জন্যই পাওয়া। এ খুশি যেন বিগত জীবনের সকল গুনাহ থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারার জন্যই। ঈদের দিন আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকা একটি সুন্নাহ। এদিন আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকা এবং অপরকে হাসিখুশি রাখাও ইবাদত।

চলুন সংক্ষেপে ঈদের দিনের সুন্নাহ বিষয়ক কয়েকটি পয়েন্ট জেনে নিই। যেগুলোর মাধ্যমে এই দিনকে আমরা ইবাদতে পরিণত করতে পারব ইনশাআল্লাহ।

ঈদের দিনের কয়েকটি সুন্নাহ আমল

বিভিন্ন হাদীস দ্বারা ঈদের দিন নবীজি (সা) এর বেশ কিছু কাজের বর্ণনা পাওয়া যায়। সেগুলো থেকে কয়েকটি সুন্নাহ সম্মত আমল পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা হলো।

  1. তাকবীরে তাশরীক
  2. খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া
  3. মিসওয়াক করা, গোসল করা ও সুগন্ধি লাগানো
  4. শরীয়তসম্মত সাজসজ্জা গ্রহণ করা
  5. কোনো কিছু না খেয়ে ঈদগাহে যাওয়া। ঈদের নামাজের পর কুরবানির গোশত দ্বারা দিনের প্রথম আহার করা
  6. যানবাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া
  7. ঈদগাহে যাওয়া ও আসার পথ ভিন্ন করা
  8. উন্মুক্ত স্থানে ঈদের সালাত আদায় করা
  9. খুতবা শোনা (ওয়াজিব)
  10. সামর্থ থাকলে কুরবানি দেয়া (ওয়াজিব)
  11. ঈদের দিন যথা সম্ভব হাসি খুশি থাকা
  12. একে অন্যকে ঈদের অভিভাদন জানানো

চলুন এবারে উপরোক্ত পয়েন্টগুলো বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

তাকবীরে তাশরীক

ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর থেকে যত বেশি পারা যায় তাকবীর দিতে থাকব। জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রতি ফরজ নামাজের পর তাকবির দেয়া ওয়াজিব। এই তাকবির সম্পর্কে মাসআলা জানতে এখানে ক্লিক করুন। ঈদুল আজহার ঈদের নামাজে অংশ নিতে ঈদগাহে যাওয়ার সময় উচ্চস্বরে তাকবীর দিতে থাকব।

اللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ لَا إلَهَ إلَّا اللَّهُ وَاَللَّهُ أَكْبَرُ اللَّهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْد

অর্থঃ আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ মহান, আল্লাহ মহান। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠা ও আগে আগে ঈদগাহে যাওয়া

ঈদের দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঈদগাহে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হওয়া এবং আগে আগে ঈদগাহে উপস্থিত হওয়া সুন্নাহ।

মিসওয়াক করা, গোসল করা ও পরিপাটি হওয়া

ঈদের দিন মিসওয়াক করা, গোসল করা ও সুগন্ধি ব্যবহার করা সুন্নাহ। শরীয়তসম্মত সাজসজ্জা গ্রহন করা সুন্নাহ। যদি ঈদগাহে নারীদের যাওয়ার সুযোগ থাকে সেক্ষেত্রে নারীরা কোনো অবস্থাতেই সুগন্ধি লাগিয়ে ঈদগাহে যাবে না। কারণ সকল অবস্থাতেই নারীদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার করে বাহিরে বের হওয়া নবীজির (সা) সরাসরি নিষেধ।

পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া

যানবাহন ব্যবহার না করে পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাহ। তবে অসুস্থ্যতা বা অন্য কোনো সমস্যা থাকলে সেটা ভিন্ন বিষয়।

ঈদগাহে যাওয়া ও আসার পথ ভিন্ন করা

ঈদগাহে যে পথ দিয়ে যাওয়া হবে, বাড়িতে ফেরত আসার সময় ভিন্ন পথে আসা সুন্নাহ। যদি বিকল্প রাস্তা না থাকে তাহলে যাওয়ার সময় রাস্তার যে পাশ দিয়ে যাব, ফেরার পথে তার বিপরীত পাশ দিয়ে ফিরব। তাহলেও ইনশাআল্লাহ এই সুন্নাহ আদায় হবে। যাওয়া আসার ভিন্ন এই পথে যত মানুষের সাথে দেখা হবে চেষ্টা করব ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় বা অন্তত সালাম বিনিময় করার। যত দরিদ্রদের সাথে দেখা হবে সাধ্য মত সকলকে সাদাকা করার চেষ্টা করব।

উন্মুক্ত স্থানে ঈদের সালাত আদায় করা

আবদ্ধ স্থানে বা মসজিদের ভিতরে ঈদের সালাত আদায় না করে উন্মুক্ত স্থানে ঈদের সালাত আদায় করা সুন্নাহ। কিন্তু যদি সেরকম সুযোগ না থাকে তাহলে মসজিদেও আদায় করা যাবে। ঈদের সালাতের বিস্তারিত নিয়ম জানা যাবে এই পোস্টে

খুতবা শোনা ওয়াজিব

জুমআর সালাতের খুতবা হয় সালাতের আগে আর ঈদের সালাতের খুতবা হয় সালাতের পরে। মুসল্লিদের জন্য চুপ থেকে খুতবা শোনা ওয়াজিব। প্রায়শ দেখা যায় খুতবা চলাকালীন সময়ে পারস্পরিক কথাবার্তা বলা, উঠে চলে যাওয়া অথবা মসজিদের জন্য টাকা কালেকশন করা হয়। এগুলো খুবই গর্হিত ও অন্যায় কাজ।

সামর্থবানদের উপর কুরবানি করা ওয়াজিব

যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাদের উপর কুরবানি করা ওয়াজিব। ঈদুল আজহার দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় আমল হচ্ছে কুরবানি করা। যাদের কুরবানি করার মত সম্পদ রয়েছে তারা কুরবানি না করলে গুনাহগার হবে। কুরবানি বিষয়ে আমাদের ব্লগের পোস্টগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন

কুরবানির গোশত দিয়ে প্রথম আহার গ্রহন করা

ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর থেকে পানাহার না করে কুরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার গ্রহন করা উত্তম। তাই যদি সম্ভব হয় আমরা সাহরির শেষ সময়ের পর থেকে কোনো কিছু খাব না। কুরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম খাবার গ্রহন করব।

ঈদের দিন যথা সম্ভব হাসিখুশি থাকা

ঈদ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য প্রদত্ত খুশির একটি দিন। তাই এদিন হাসিমুখে থাকা ও আনন্দিত থাকাও একটা ইবাদত। আমাদের মধ্যে অনেকেই অনেক কষ্ট ও দুর্দশার মধ্যে আছেন। তাও চেষ্টা করব এই দিনটি আনন্দিত ও হাসিখুশি থাকার জন্য। আল্লাহ আমাদের সকলের দুনিয়া ও আখিরাতকে সুখ-শান্তি ও আনন্দময় করুন। আমীন।

ঈদের দিন একে অন্যকে অভিভাদন জানানো

দেখা হলে বা কারো সাথে ফোনে/মেসেজে কথা হলে আমরা পরস্পরকে অভিভাদন জানাব। সাহাবীগণ (রা) ঈদের দিন দেখা হলে পরস্পরকে সুন্দর একটি দুআ করার মাধ্যমে শুভেচ্ছা বিনিময় করতেন। তা হচ্ছেঃ

تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنكُم

অর্থঃ আল্লাহ আমাদের পক্ষ থেকে এবং আপনার পক্ষ থেকে (নেক আমলগুলো) কবুল করে নিন।

এই বাক্যটি পড়লে একটা সুন্দর দুয়া করা হলো এবং সাহাবীদের (রা) একটা সুন্নাহের উপর আমল হল। এটা না বলে প্রচলিত ঈদ মুবারক বলাও জায়েজ আছে। এর অর্থ বা উদ্দেশ্য হচ্ছে “তোমার ঈদ মুবারক বা বরকতময় হোক”। তাই ঈদ মুবারক বললেও এতে কোনো অসুবিধা নাই। অভিভাদন জানানোর আগে সালাম দিতে হবে।

عَنْ خَالِدِ بْنِ مَعْدَانَ قَالَ: لَقِيتُ وَاثِلَةَ بْنَ الْأَسْقَعِ فِي يَوْمِ عِيدٍ , فَقُلْتُ: تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكَ , فَقَالَ: ” نَعَمْ، تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكَ ” , قَالَ وَاثِلَةُ: ” لَقِيتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عِيدٍ فَقُلْتُ: تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكَ , قَالَ: ” نَعَمْ , تَقَبَّلَ اللهُ مِنَّا وَمِنْكَ “

হযরত খালিদ বিন মা’দান থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি ওয়াছিলা বিন আসক্বাহ রাঃ এর সাথে ঈদের দিন সাক্ষাৎ করলাম। তখন আমি তাকে বললামঃ তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা। তখন তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকা। ওয়াছিলা আরো বললেনঃ আমি একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ঈদের দিন সাক্ষাৎ করেছিলাম। তখন বলেছিলামঃ তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকা। তখন তিনিও বলেছিলেনঃ হ্যাঁ, তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়ামিনকা।
সূত্র – সুনানুল কুবরা লিলবায়হাকী, হাদীস নং-৬২৯৪, মাযমাউয যাওয়ায়েদ, হাদীস নং-৩২৫৫

ঈদ সম্পর্কিত ৩ টি ভুল ধারণা

  1. ঈদের দিন কবর যিয়ারতকে সুন্নত মনে করাঃ যে কোনো দিনই কবর যিয়ারত করা যেতে পারে। কিন্তু বিশেষ করে ঈদের দিন কবর যিয়ারতকে সুন্নত বা বিশেষ সওয়াবের কাজ বা বিশেষ ভাবে করণীয় মনে করা ভুল। আমরা আমাদের আবেগের জায়গা থেকে প্রিয়জনেরা যারা কবরবাসী হয়ে গিয়েছেন তাদের জন্য দুআ করতে ঈদের দিন কবর যিয়ারত করতে যাই। মৌলিক ভাবে ঈদের দিন কবর যিয়ারত করতে যেতে কোনো অসুবিধা নাই। কিন্তু এমনটা মনে করা যাবে না বা এমন intention রাখা যাবে না যে, ঈদের দিন কবর যিয়ারত করলে বিশেষ কোনো ফজিলত বা বিশেষ কোনো সুন্নত পালন হলো।
  2. কোলাকুলি করাকে সুন্নত মনে করাঃ কোনো মুসলিম ভাইয়ের সাথে অনেক দিন পর দেখা হলে মু’আনাকা বা কোলাকুলি করা হয়ে থাকে। কিন্তু এটি ঈদের দিনের জন্য খাস বা বিশেষ কোনো আমল নয়। ঈদে বাড়িতে গিয়েছি বা ঈদের দিন কোনো আত্মীয় স্বজন বা বন্ধুর সাথে অনেক পর দেখা হলো তার সাথে সম্প্রীতি ও ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসাবে কোলাকুলি করতেই পারি। এটা অন্য সময়ের পর সাধারন কোলাকুলি। ঈদ উপলক্ষ্যে কোলাকুলি করাকে বিশেষ আমল বা সুন্নত মনে করাটা ভুল।
  3. ঈদের দিন নতুন জামা পরাকে সুন্নাহ মনে করাঃ ঈদের দিন সংগ্রহে থাকা জামাগুলোর মধ্যে উত্তম জামাটি পরিধান করা সুন্নাহ। সেটা নতুন কেনা হতে পারে বা পুরাতনও হতে পারে। উত্তম জামা পরিধানের আমল করার জন্য নতুন জামাই হতে হবে এটা জরুরি নয়। বরং যে জামাটি সবচেয়ে ভাল আমরা চেষ্টা করব সেটি পরার জন্য। তা নতুন বা পুরাতন যাই হোক না কেন।

ঈদ উদযাপনে কতিপয় হারাম কাজ

সারা মাস আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী শেষে ঈদের দিনটা অনেকে উদযাপন করেন হারাম কার্যক্রমের মাধ্যমে। তাদের জন্য সমবেদনা। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হারাম কাজ পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো।

  1. গান-বাজনার মাধ্যমে ঈদ উদযাপন। এটি অন্য সময়ে যেমন হারাম, ঈদের দিনেও হারাম। মহল্লায় মহল্লায় দেখা যায় ঈদের আগের রাত থেকে সারা রাত ভর উচ্চ শব্দে গান বাজানো হয়। কোনো রুচিশীল মানুষের পক্ষে এটা শোভা পায় না।
  2. পর্দার বিধান লঙ্ঘন করা অন্যান্য দিনের মত ঈদের দিনেও হারাম। পুরুষদেরকে অন্য সময়ের মত ঈদের দিন নজরের হেফাজত করতে হবে আরো বেশি। আর নারীদেরও উচিত বেহুদা গুনাহ কামানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ করে ঘুরে না বেড়ানো।
  3. সালাত ছেড়ে দেয়া অন্যান্য সময়ে যেমন হারাম, ঈদের দিনেও হারাম। তাই কোনো অবস্থাতেই আনন্দ উল্লাসে মেতে সালাতের কথা যেন ভুলে না যাই।

আল্লাহ আমাদের ঈদ উদযাপনকে ইবাদতের মাধ্যম বানিয়ে দিন। সকল প্রকাশ হারাম ও অশালীন কাজ থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন। রামাদানের উদ্দেশ্য ছিল আমাদেরকে মুত্তাক্বী বানানো। ঈদের দিন ও পরবর্তী সারা বছর যেন আমরা মুত্তাক্বী হিসাবে জীবন-যাপন করতে পারি সেই তাওফিক আল্লাহ দান করুন। আমীন।

তথ্যসূত্র

  1. মুসল্লিদের জন্য চুপ থেকে খুতবা শোনা ওয়াজিব – মাসিক আলকাউসার
  2. জুমআর খুতবা হবে সালাতের আগে এবং ঈদের খুতবা সালাতের পরে – মাসিক আলকাউসার
Comments
  1. আমাদের মোবাইলে কোরআন এপ থাকে,,, অনেক সময় অনেকে রাগ করে মোবাইল ছুড়ে ফেলে,, এতে কি কোরআন অবমাননা হবে? আউট প্রশ্ন করলাম তবুও উত্তর দিন প্লিজ🥺

    1. যদি কুরআন-অ্যাপ খোলা না থাকে, তবে এতে কুরআন অবমাননা হবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

- আমি মুসলিমস ডে এর কমেন্টের নীতিমালার সাথে একমত হয়ে পোস্ট করছি

সাম্প্রতিক পোস্ট সমূহ
ক্যাটাগরি সমূহ
ট্যাগ সমূহ
error: অনুগ্রহ করে লেখাটি কপি করবেন না। লিংক শেয়ার করুন। ধন্যবাদ